তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ: ‘তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চলবে না’ বলে কড়া জবাব চীনের
বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও কৃষি খাতের ভাগ্য বদলে দেওয়ার জন্য বহুল প্রতীক্ষিত 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' বাস্তবায়নে জোর গতিতে এগোচ্ছে ঢাকা ও বেইজিং।
সম্প্রতি এই প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করায় তীব্র কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের সেই উদ্বেগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে বেইজিং।
ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ কী?
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI) এবং এনডিটিভির (NDTV) প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের মূল উদ্বেগের কারণ হলো এই প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান। তিস্তা নদী যেখানে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, সেই অববাহিকাটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযোগকারী কৌশলগত অত্যন্ত সংবেদনশীল 'শিলিগুড়ি করিডোর' বা 'চিকেনস নেক'-এর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই অঞ্চলে চীনা প্রকৌশলী বা ভূ-প্রকৌশলগত কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বলল চীন
বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের এই উদ্বেগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, আমি এই বিষয়ে জোর দিয়ে বলতে চাই যে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় ও এটি যে কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা উচিত।
তিনি বলেন:"তিস্তা নদীর ব্যাপক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার একটি সম্পূর্ণ জনকল্যাণমূলক এবং জীবন-জীবিকার প্রকল্প, যেটিকে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত উচ্চ গুরুত্ব দেয়। চীন এই প্রকল্পকে সমর্থন করতে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সবকিছু করতে প্রস্তুত।"
বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান এবং হাইড্রোলজিক্যাল বাস্তবতা
দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানির সংকট, আর বর্ষায় দেখা দেয় নদীভাঙন ও বন্যা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে কোনো সমাধান দিতে না পারায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব সার্বভৌম অধিকার থেকে চীনা প্রকৌশল ও পুঁজির সাহায্যে দেশের অভ্যন্তরে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি নদী ড্রেজিং, বাঁধ ও জলাধার নির্মাণের এই মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে চীন প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে চলছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পকে বেইজিং ও ঢাকা সম্পূর্ণ একটি মানবিক এবং পরিবেশগত 'ক্লাইমেট-অ্যাডাপ্টেশন' প্রোগ্রাম হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেছে। ফলে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে চলমান একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সরাসরি বিরোধিতা করা নয়াদিল্লির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ-চীন যৌথ সমীক্ষা ও সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বৃদ্ধি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা এবারই প্রথম একটি কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করবেন। মন্ত্রী বলেন, উভয় পক্ষই এই বিষয়ে একমত হয়েছে, যা গতবার এই পর্যায়ে ছিল না।
সমীক্ষায় প্রকল্পের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হওয়ায় চীন এই প্রকল্পে সম্ভাব্য সব ধরণের সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তিস্তাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও চীন এরই মধ্যে একটি চুক্তিতেও পৌঁছেছে। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে যেকোনো ধরনের ঘোষণার ওপর ভারত এখন কড়া নজর রাখছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাউবো) ও চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’ তাদের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বৃদ্ধির চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।






