সুপার টিকা’ উদ্ভাবনের পথে বিজ্ঞানীরা

২৬ জুন, ২০২৬ - রাত ১২:৪৬
 298
সুপার টিকা’ উদ্ভাবনের পথে বিজ্ঞানীরা
সুপার টিকা’ উদ্ভাবনের পথে বিজ্ঞানীরা

কোভিড-১৯, ইবোলা কিংবা সার্স এর মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বহুবার বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বহুবার। প্রতিটি ভাইরাসের জন্য আলাদা টিকা তৈরি হলেও নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নতুন ধরনের একটি টিকা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা।

গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি ভাইরাসের একটি নির্দিষ্ট রূপ নয়, বরং পুরো একটি ভাইরাস পরিবারের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন হিনি এই প্রযুক্তিকে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ‘মাস্টার কি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষায়, বর্তমানে ব্যবহৃত টিকাগুলো সাধারণত অতীতের কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাস ধরণকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়। ফলে কয়েক মাস পর যদি ভাইরাসের নতুন কোনো রূপ দেখা দেয়, তখন আগের টিকার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকল্পটির প্রধান গবেষক হিনি বলেন, “টিকা সব সময় ভাইরাসের পেছনে ছুটে বেড়ায়।”

তিনি জানান, তাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যা ভাইরাসের বিভিন্ন রূপকে একসঙ্গে চিনতে পারবে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কার্যকর সুরক্ষা দেবে। তার মতে, এটি টিকা উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ধারণাগত পরিবর্তন।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগের ভাইরাল জুনোটিকস ল্যাবরেটরির গবেষক হিনি ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা প্রাদুর্ভাবের পর এ প্রকল্পে কাজ শুরু করেন। সে সময় তিনি সরাসরি ওই অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন।

ইবোলা প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষা

পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার প্রাদুর্ভাব ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। শুরুতে রোগটিকে লাসা জ্বর, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস বা কলেরা হিসেবে ভুল শনাক্ত করা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রাদুর্ভাবে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

হিনি বলেন, রোগটি শনাক্ত করতেই তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যায়। ফলে টিকা তৈরির কাজ শুরু করতেও দেরি হয়। এরই মধ্যে রোগটি দ্রুত গিনি, সিয়েরা লিওন ও লাইবেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীও ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতার পর ক্যামব্রিজে ফিরে এসে গবেষকরা উপলব্ধি করেন যে, বিদ্যমান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি।

তিনি জানান, এআই প্রযুক্তির প্রাথমিক সংস্করণ ব্যবহার করে তাদের দল বিভিন্ন ভাইরাস সম্পর্কে সংগৃহীত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে। এর মাধ্যমে ভাইরাসের এমন অংশগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়, যেগুলোর প্রতি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সাড়া দেয়। ফলে শুধু একটি ভ্যারিয়েন্ট নয়, বরং ভাইরাসের বিভিন্ন রূপকে লক্ষ্য করে টিকা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়।

হিনির মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং মানুষের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় নতুন ভাইরাসের আবির্ভাব এখন আরও ঘন ঘন ঘটছে।

তিনি বলেন, আগে যেসব ভাইরাস প্রাণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন মানুষের সংস্পর্শে আসছে। আর মানুষের শরীরে সেসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

‘ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে’ নতুন প্রযুক্তি

‘সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটি হসপিটাল’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ৩৯ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষায় এআই-সহায়তায় তৈরি সার্বজনীন সারবেকো করোনাভাইরাস টিকার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্বেগ পাওয়া যায়নি।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে সংক্রামক রোগবিষয়ক পিয়ার-রিভিউড মেডিকেল জার্নাল ‘জার্নাল অব ইনফেকশন’-এ।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এবং বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান ডায়োসিনভ্যাক্সের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই টিকা এখন আরও বৃহৎ পরিসরের পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে।

হিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মানব ইতিহাসে বহুবার ভয়াবহ মহামারি দেখা গেছে। মধ্যযুগের ব্ল্যাক ডেথ থেকে শুরু করে ১৯১৮-২০ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সম্ভাব্য ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি, যাকে তিনি সবচেয়ে জটিল ভাইরাসগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে তিনি আশাবাদী, নতুন এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরেকটি প্রাণঘাতী মহামারি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

হিনি বলেন, “এখন এআই-এর সম্পূর্ণ নতুন একটি স্তর তৈরি হয়েছে। সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের একটি দল আরও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলছে, যাতে আমরা আরও দ্রুত এবং অধিকতর তথ্য নিয়ে কাজ করতে পারি।”

তার বিশ্বাস, এই প্রযুক্তি শুধু টিকা উন্নয়নের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করবে না, বরং ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও বদলে দিতে সক্ষম হবে।