স্ত্রী তালাক দিলে কি দেনমোহর পাবেন? আইন কী বলছে

১২ জুন, ২০২৬ - দুপুর ৩:২৯
স্ত্রী তালাক দিলে কি দেনমোহর পাবেন? আইন কী বলছে
স্ত্রী তালাক দিলে কি দেনমোহর পাবেন? আইন কী বলছে

বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দেন, তাহলে তিনি কি দেনমোহর বা মোহরানার টাকা পাওয়ার অধিকার হারান?

আইনজীবী ও পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ত্রী তালাক দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেনমোহরের অধিকার হারিয়ে ফেলেন—এমন কোনো বিধান বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নেই। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বকেয়া দেনমোহর আদায়ের অধিকার স্ত্রীর বহাল থাকে।

দেনমোহর কী?

মুসলিম পারিবারিক আইনে দেনমোহর হলো স্ত্রীর জন্য স্বামীর ওপর আরোপিত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়। বিয়ের সময় কাবিননামায় নির্ধারিত এই অর্থ স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিবাহবিচ্ছেদ হলেও দেনমোহরের দাবি সাধারণত বহাল থাকে, যদি না স্ত্রী স্বেচ্ছায় তা মওকুফ করেন।

স্ত্রী কীভাবে তালাক দিতে পারেন?

বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী একজন স্ত্রী কয়েকটি উপায়ে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে পারেন।

প্রথমত, কাবিননামায় যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন, তাহলে স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তালাক দিতে পারেন। এটিকে ‘তাফওয়ীজ তালাক’ বলা হয়।

দ্বিতীয়ত, ১৯৩৯ সালের Dissolution of Muslim Marriages Act অনুযায়ী নির্দিষ্ট কারণে আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করা যায়।

এ ছাড়া পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ‘খুলা’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব।

তালাক দিলে কি দেনমোহর পাওয়া যাবে?

আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র স্ত্রী তালাক দিয়েছেন—এ কারণে তার দেনমোহরের অধিকার বাতিল হয় না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, দেনমোহর মূলত বিয়ের চুক্তি থেকে উদ্ভূত একটি আর্থিক অধিকার। তাই বিবাহবিচ্ছেদের উদ্যোগ কে নিয়েছেন, সেটি সব সময় নির্ধারক বিষয় নয়।

যদি দেনমোহরের অর্থ পরিশোধ না করা হয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে তা আদায়ের জন্য মামলা করতে পারেন।

কোন ক্ষেত্রে দেনমোহর নাও পাওয়া যেতে পারে?

তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়।

বিশেষ করে ‘খুলা’ তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহরের সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ ছেড়ে দিতে সম্মত হন, তাহলে পরবর্তীতে সেই অংশ দাবি করার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

এ ছাড়া কাবিননামায় বিশেষ কোনো শর্ত থাকলে আদালত সেই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে পারেন।

আইন অনুযায়ী তালাকের প্রক্রিয়া

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী তালাক কার্যকর করার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

তালাকের লিখিত নোটিশ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাতে হয়। এরপর সালিশি কাউন্সিল গঠন করা হয় এবং আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তালাক কার্যকর হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পরে জটিলতার সৃষ্টি হয়।

সচেতনতার অভাব

পারিবারিক আদালতের আইনজীবীদের মতে, দেশে এখনো অনেক নারী তাদের দেনমোহর ও অন্যান্য আইনি অধিকার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন। ফলে বিবাহবিচ্ছেদের পরও অনেকেই পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য আইনগত পদক্ষেপ নেন না।

তাদের মতে, তালাকের ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে আইনি বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।

যা জানা জরুরি

আইন অনুযায়ী স্ত্রী যদি স্বামীকে তালাক দেন, তাহলেও তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেনমোহরের অধিকার হারান না। তবে ‘খুলা’, পারস্পরিক সমঝোতা বা দেনমোহর মওকুফ সংক্রান্ত বিশেষ চুক্তি থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

এ কারণে প্রতিটি ঘটনার বাস্তবতা, কাবিননামার শর্ত এবং আদালতের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারিত হয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।