জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে কতটা?

২২ জুন, ২০২৬ - সকাল ৫:১৭
 335
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে কতটা?
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশে

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এবং উদ্বেগজনক বিষয়। একসময় এটি শুধুমাত্র বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আলোচনার বিষয় ছিল, কিন্তু বর্তমানে এর প্রভাব পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করছে।

বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব, নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম প্রায়ই উঠে আসে। গত কয়েক দশকে দেশের আবহাওয়া, কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তার বড় একটি অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী গরম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল আগের তুলনায় আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে। তীব্র তাপপ্রবাহে স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, শ্রমজীবী মানুষ কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং হাসপাতালে তাপজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকছেন।

আবহাওয়ার এই পরিবর্তন কৃষি খাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি এবং বন্যার কারণে কৃষকরা আগের মতো নির্ভরযোগ্যভাবে ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না। অনেক এলাকায় ধানের চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পুরো দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর পড়ে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। যে জমিতে একসময় ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন হতো, সেই জমির অনেক অংশ এখন লবণাক্ত পানির কারণে অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। শুধু কৃষিজমিই নয়, অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। মানুষকে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে নারী ও শিশুদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি বাড়ছে।

ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। অতীতে সিডর, আইলা, আম্পানসহ বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু এবং জীবিকা হারিয়ে অনেক মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে গেছেন। দুর্যোগের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে অনেক পরিবারের বছরের পর বছর লেগে যায়।

নদীভাঙন বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা। দেশের বিভিন্ন নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা এবং নদীর প্রবাহের ধরনে পরিবর্তন আসায় নদীভাঙনের ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা তাদের বসতভিটা হারান, তাদের অনেকেই শহরে গিয়ে বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। ফলে শহরাঞ্চলেও নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও গভীরভাবে পড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দূষিত পানি এবং জলাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার প্রকোপ অনেক এলাকায় বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত চাপ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও প্রভাবিত করতে পারে।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও এই পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল, জলাভূমি এবং নদীভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র বিভিন্নভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরবন, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে পরিচিত, সেটিও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এই বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতির ওপরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। সড়ক, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব পুনর্নির্মাণে সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

তবে চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কৃষি গবেষকরা লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল ফসল উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা শুধুমাত্র সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবেশ দূষণ কমানো, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি, পানি ও জ্বালানির অপচয় রোধ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।

জলবায়ু পরিবর্তন আজ বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সচেতনতা, পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষ অতীতেও নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করে এগিয়ে গেছে, ভবিষ্যতেও সঠিক প্রস্তুতি ও উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।