দিল্লিতে নবজাতক কেনাবেচার ভয়ংকর চক্র, ছেলেশিশুর দাম ৮ লাখ রুপি!
পৃথিবীতে নানা ধরনের বাজারের কথা শোনা যায়। কিন্তু নবজাতক শিশু কেনাবেচার একটি সংগঠিত বাজারের সন্ধান মিলেছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে।
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে এমন এক চাঞ্চল্যকর চক্রের তথ্য, যেখানে দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে শিশু কিনে বা চুরি করে এনে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে লাখ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো।
তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল একটি বেসরকারি হাসপাতাল। রাজস্থানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা নবজাতকদের দিল্লিতে এনে রাখা হতো। পরে হাসপাতালের এক চিকিৎসকের মধ্যস্থতায় সেগুলো বিক্রি করা হতো বিভিন্ন রাজ্যের ক্রেতাদের কাছে।
চক্রটির ব্যবসায় ছেলেশিশুর চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। একটি ছেলেশিশু ৬ থেকে ৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। অন্যদিকে কন্যাশিশুর দাম ছিল ৩ থেকে ৪ লাখ রুপি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের বয়স ছিল মাত্র কয়েক দিন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগের মাধ্যমে। তিনি পুলিশকে জানান, একটি নারীকে নিয়মিত নতুন নতুন নবজাতক শিশু নিয়ে এলাকায় দেখা যায়, যা তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ ও গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে পুলিশ নিশ্চিত হয়, জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামের ওই নারী শিশু পাচার চক্রের সদস্য। পরে এক নারী পুলিশ সদস্যকে ক্রেতা সাজিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। শিশু বিক্রির চুক্তির পর ৫ জুন একটি নবজাতক হস্তান্তরের সময় কমলেশকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
কমলেশকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ তার সহযোগী শালু, ললিত, প্রতিভা ও বিপিনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৩ লাখ রুপি। দুই সপ্তাহের অভিযানে এক মাসের কম বয়সী পাঁচ নবজাতককে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
এরপর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে পশ্চিম দিল্লির রোহিণীর বেগমপুর এলাকায় অবস্থিত হীরা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। পুলিশের দাবি, হাসপাতালটি কার্যত শিশু কেনাবেচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। হাসপাতালের মালিক ডাক্তার বিবেকীকে এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, পাচারকারীরা নবজাতকদের হাসপাতালে এনে রাখত এবং বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই রাখা হতো। শিশুদের জন্য ভুয়া জন্মসনদ, হাসপাতালের নথি ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে তাদের পরিচয় গোপন করা হতো।
পুলিশের তথ্যমতে, একটি কন্যাশিশু প্রায় ১ লাখ রুপিতে সংগ্রহ করে ৩ থেকে ৪ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো। আর ছেলেশিশু প্রায় ২ লাখ রুপিতে কিনে ৬ থেকে ৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো।
দিল্লি সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং সাংবাদিকদের জানান, শিশু কেনাবেচার অধিকাংশ চুক্তিই ওই হাসপাতালের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। ডাক্তার বিবেকী পাচারকারী ও ক্রেতাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন।
পরে গুজরাটের সবরকান্থা থেকে সাবাভাই গামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রাজস্থানের বিভিন্ন দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে শিশু সংগ্রহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ বর্তমানে উদ্ধার হওয়া শিশুদের প্রকৃত মা-বাবার সন্ধান করছে। তারা স্বেচ্ছায় সন্তান বিক্রি করেছেন, নাকি শিশুদের চুরি করা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু বিক্রি ও কেনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে আরও জানা গেছে, গত এক বছরে চক্রটি অন্তত ৩০ নবজাতক বিক্রি করেছে। ইতোমধ্যে হরিয়ানার পানিপথ এবং মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে শিশু কেনা কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক দম্পতি পুত্রসন্তান কিনতে চাইলেও চক্রটি তাদের কাছে একটি ছেলে ও একটি মেয়েকে ‘যমজ’ পরিচয়ে ৯ লাখ রুপিতে বিক্রি করে। পরে তদন্তে জানা যায়, দুটি শিশুর মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্কই ছিল না।
ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং এই চক্র ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য সাব-ইন্সপেক্টর প্রগতি, যামিনী এবং হেড কনস্টেবল সুষমার প্রশংসা করেন।
উদ্ধার হওয়া পাঁচ নবজাতককে আপাতত চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। প্রকৃত অভিভাবকদের খুঁজে না পাওয়া গেলে আইনগত প্রক্রিয়ায় তাদের দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।






