মোঃ মনির উজ-জামান (সাবেক সচিব, রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ পরামর্শক - বিশ্বব্যাংক): বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম
মোঃ মনির উজ-জামান ১৯৩৬ সালের ০১ জানুয়ারি তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলার চৌগাছা থানার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম তোফাজ্জল হোসেন এবং মাতা মরহুমা সারা হোসেন।
বাংলাদেশের প্রশাসন, কূটনীতি ও জনসেবার ইতিহাসে কিছু মানুষের কর্মজীবন তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয় জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। জনাব মোঃ মনির উজ-জামান ছিলেন তেমনই একজন প্রজ্ঞাবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবান রাষ্ট্রসেবক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি)-এর একজন মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সচিব, রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার পরামর্শক হিসেবে দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর জীবন ছিল শিক্ষা, কর্মনিষ্ঠা, দেশসেবা, নেতৃত্ব ও পারিবারিক ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়।
পারিবারিক ঐতিহ্যঃ
তাঁর পিতা মরহুম তোফাজ্জল হোসেন ১৯০৫ সালে বর্তমান যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের, জগদীশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যশোর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বৃটিশ ইন্ডিয়ার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি যশোর কালেক্টরেট অফিসে ট্রেজারার পদে এক বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ছেড়ে মুসলিম লীগের সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হোসিয়ারি শিল্প প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনকল্যাণ ও সমাজসেবার প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি তাঁর সম্পত্তির একটি অংশ বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে দান করেন। সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ড ও দানশীলতার কারণে তিনি একজন বিশিষ্ট দানবীর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পিতা-পিতামহের পারিবারিক ঐতিহ্যও ছিল সামাজিক মর্যাদা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ। তাঁর দাদা ইসমাইল খান স্থানীয়ভাবে একজন জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই ঐতিহ্যবাহী পরিবার ও মূল্যবোধের পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন এম. মনির উজ-জামান।
শিক্ষাজীবনঃ
শৈশব থেকেই জনাব মোঃ মনির উজ-জামান ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী ছাত্র। তিনি ১৯৫০ সালে যশোর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৫৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে দেশের গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৫৯ সালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি হল থেকে ডিপ্লোমা ইন পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিপিএ) অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএস ডিগ্রি লাভ করেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্জিত শিক্ষা তাঁর পরবর্তী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে।
সিএসপি ও কর্মজীবনের সূচনাঃ
১৯৫৮ ব্যাচের একজন মেধাবী বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে জনাব মোঃ মনির উজ-জামান তৎকালীন পাকিস্তানের মর্যাদাপূর্ণ সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি)-এ যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সরকারি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১১ জন কর্মকর্তা সিএসপিতে যোগদান করেন। তাঁদের মধ্যে জনাব মোঃ মনির উজ-জামান তৎকালীন পাকিস্তানের সম্মিলিত মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন—যা তাঁর অসাধারণ মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে মোট ২২২ জন সিএসপি কর্মকর্তা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এর মধ্যে বৃহত্তর যশোর অঞ্চল থেকে মাত্র ছয়জন (১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত) এই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ সিভিল সার্ভিসে যোগদানের সুযোগ লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে জনাব মোঃ মনির উজ-জামানের স্থান ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতাপূর্ব কর্মজীবনঃ
সরকারি কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কিশোরগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও), কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) এবং বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাঠ প্রশাসনের এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান সরকারের বৈদেশিক অর্থ বিভাগের উপসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ইপিএসসিআইসি-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর কর্মজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বঃ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। দেশের প্রশাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বৈদেশিক সম্পদ বিভাগ—যা বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)—সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)-এর রাষ্ট্র পরিচালনার সময় অসামান্য কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা ও দেশসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মোট সাতজন সিভিল সার্ভিস অফিসারকে “কর্মদক্ষতার পুরস্কার” প্রদান করা হয়। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও উৎকর্ষ, গভীর দেশপ্রেম এবং দেশসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের স্বীকৃতিস্বরূপ মরহুম মোঃ মনির উজ-জামানও, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)-এর কাছ থেকে এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। এই অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গৌরবের বিষয় ছিল না; বরং তৎকালীন প্রজন্মের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এটি ছিল নিষ্ঠা, সততা, কর্মদক্ষতা ও দেশসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর এই স্বীকৃতি সে সময়ের সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করেছিল এবং জনসেবায় আরও আন্তরিকতা ও পেশাগত উৎকর্ষ অর্জনে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে প্রকাশিত শ্বেতপত্র (হোয়াইট পেপার) প্রণয়ন-সংক্রান্ত সেলের প্রধান পরামর্শক হিসেবে মরহুম মোঃ মনির উজ-জামানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি তাঁর ওপর অর্পিত এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করেন।
(নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও উৎকর্ষ, গভীর দেশপ্রেম এবং দেশসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের স্বীকৃতিস্বরূপ মরহুম মোঃ মনির উজ-জামান , শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)-এর কাছ থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন। ছবিতে দাঁড়িয়ে আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) পিছনে (মাঝ খানে) এবং মরহুম মোঃ মনির উজ-জামান সামনের সারিতে ডান্ দিক থেকে চতুর্থ।)
অবসর-পরবর্তী কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কর্মজীবনঃ
সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অবসান ঘটেনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে প্রকাশিত শ্বেতপত্র (হোয়াইট পেপার) প্রণয়ন-সংক্রান্ত সেলের প্রধান পরামর্শক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ওপর অর্পিত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। এবং তাঁর কর্মদক্ষতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ফিলিপাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার পরিচয় দেন।
রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখেন। এভাবে তাঁর কর্মজীবন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রচলিত পরিসর অতিক্রম করে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়।
পরিবার ও উত্তরসূরিঃ
১৯৬২ সালে জনাব মোঃ মনির উজ-জামান, মিসেস নিলুফার জামানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মিসেস নিলুফার জামান চট্টগ্রামের সেন্ট স্কলাস্টিকা হাই স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। তিনি মরহুম মাহবুব আহমেদ চৌধুরীর কন্যা। মরহুম মাহবুব আহমেদ চৌধুরী ছিলেন মরহুম আবদুল গনি চৌধুরীর দ্বিতীয় পুত্র। আবদুল গনি চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের খ্যাতনামা জমিদার এবং বিখ্যাত ‘হাতি কোম্পানি’র মালিক।
জনাব মোঃ মনির উজ-জামান ও মিসেস নিলুফার জামানের দুই পুত্র—বড় ছেলে জনাব সামি আহমেদ রিয়াজ এবং ছোট ছেলে জনাব তারেক রিয়াজ খান।
সামি আহমেদ রিয়াজ (বড় ছেলে):
জনাব সামি আহমেদ রিয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় বি.কম (অনার্স) ও এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানিতে (বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো) ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। এবং তিনি তার কর্মদক্ষতার মাধ্যমে সিনিয়র ম্যানেজার পদে উন্নীত হন। ২০০১ সালে পরিবারের সঙ্গে কানাডায় অভিবাসনের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে তিনি কৃতিত্বের সহিত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কানাডায় সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সম্প্রতি তিনি কানাডা সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে অবসর উত্তর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) আছেন।
জনাব সামি আহমেদ রিয়াজ এর স্ত্রী, মিসেস শায়লা রিয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ থেকে বিএসএস (সম্মান) এবং এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। মিসেস শায়লা রিয়াজ মরহুম মো. ফরিদ উদ্দিনের কন্যা। মরহুম মো. ফরিদ উদ্দিন নারায়ণগঞ্জের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি ছিলেন। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তান রয়েছে। পুত্র কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করে বর্তমানে রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডা -তে কর্মরত আছেন। তাঁদের কন্যাও কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে তিনি অটোয়ায় কানাডার ফেডারেল সরকারের একজন সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। তাদের এক মাত্র কন্যার স্বামীও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক “ব্যাংক অব কানাডাতে” কর্মরত। তাঁদের পরিবারে বর্তমানে পাঁচজন নাতি-নাতনি রয়েছেন।
তারেক রিয়াজ খান (ছোট ছেলে):
জনাব তারেক রিয়াজ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং মার্কেটিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি বেক্সিমকো গ্রুপে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে তাঁর পেশাজীবন শুরু করেন এবং সেখানে তিন বছর সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার হিসেবে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করেন। প্রায় তিন দশকের ব্যাংকিং ও ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতায় তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নিজেকে একজন সুপরিচিত এবং স্বনামধন্য ব্যাংকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে প্রায় ১৬ বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। বিশেষ করে রিটেইল ও ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও মালয়েশিয়ায় কাজের ও পেশাগত অ্যাটাচমেন্টের সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীতে ব্যাংক আলফালাহ বাংলাদেশে, রিটেইল ও ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ের কান্ট্রি হেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি), চিফ অপারেটিং অফিসার এবং ক্যামেলকোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (এমডি ও সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে পদ্মা ব্যাংক থেকে পদত্যাগের পর একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি এনআরবি ব্যাংক পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ব্যাংকিং খাতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্যে ডিজিটাল ব্যাংকিং, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, রেমিট্যান্স এবং ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জনাব তারেক রিয়াজ খান এর স্ত্রী মিসেস নাসরীন রিয়াজ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে মার্কেটিং বিষয়ে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। মিসেস নাসরীন রিয়াজ খান মরহুম মো. রইস খানের কন্যা। তাঁর পিতা ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ফ্রন্টে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান পুলিশে “ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা” হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁদের দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তান রয়েছে। জ্যেষ্ঠ পুত্র বর্তমানে যুক্তরাজ্যের “ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ে”, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এমএসসিতে অধ্যয়নরত আছেন।
তাঁদের একমাত্র কন্যা টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে স্নাতক (ব্যাচেলর) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের, মাঙ্ক স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসিতে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স বিষয়ে দুই বছর মেয়াদি প্রফেশনাল মাস্টার্স প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত আছেন। তার স্বামী কানাডার টরন্টোস্থ “সেনেকা কলেজ” থেকে মার্কেটিং বিষয়ে বিবিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।"
তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র বর্তমানে দেশের একটি স্বনামধন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গ্রেড-৮ (VIII) এ অধ্যয়নরত।
প্রয়াণঃ
দীর্ঘ কর্মময় জীবন, রাষ্ট্র ও দেশের সেবায় উৎসর্গ করার পর জনাব মোঃ মনির উজ-জামান বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ২৮মে ২০২৬ সালে ঢাকায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রশাসন, কূটনীতি ও জনসেবার অঙ্গনে এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
একজন মেধাবী সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন, আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ—তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাফল্য কেবল একটি পদ বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তাঁর কর্ম, সততা, প্রজ্ঞা এবং সমাজ ও দেশের প্রতি অবদানের মধ্য দিয়ে। জনাব মোঃ মনির উজ-জামানের জীবন ছিল সেই মূল্যবোধেরই প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি যে জ্ঞান,অভিজ্ঞতা ও মানবিক মূল্যবোধের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা তাঁর পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, দেশসেবা ও পারিবারিক ঐতিহ্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল।
লেখকঃ মোঃ আরিফুজ্জামান






