কর্পোরেট গভর্নেন্সে এআই:
কোম্পানি সচিবালয়ের আধুনিকায়ন ও নতুন দিগন্ত আধুনিক কর্পোরেট বিশ্বে ‘কোম্পানি সচিব’ বা কোম্পানি সেক্রেটারি (সিএস) এবং কোম্পানি সচিবালয় হলো করপোরেট সুশাসন ও পরিচালনা পর্ষদের প্রধান চালিকাশক্তি।
বোর্ডের সভা আয়োজন, আইনি বাধ্যবাধকতা রক্ষা এবং পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন -সবকিছুই পরিচালিত হয় এই বিভাগ থেকে। তবে তথ্য ও প্রযুক্তির অদম্য অগ্রযাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর কেবল আইটি বিভাগের বিষয় নয়; এটি করপোরেট বোর্ডরুম ও সচিবালয়ের দৈনন্দিন কাজকে দ্রুত, নির্ভুল এবং কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
বোর্ড মিটিং ব্যবস্থাপনা ও মিনিটের খসড়া তৈরি
কোম্পানি সচিবালয়ের একটি বড় সময় ব্যয় হয় বোর্ড মিটিংয়ের এজেন্ডা প্রস্তুত করা,দীর্ঘ আলোচনার সারসংক্ষেপ করা এবং সুনির্দিষ্ট ‘মিনিটস’ বা কার্যবিবরণী লেখার পেছনে। এআই-চালিত আধুনিক টুলগুলো সভার অডিও ট্রান্সক্রিপশন বিশ্লেষণ করে সেকেন্ডের মধ্যে নির্ভুল ও সুনির্দিষ্ট কার্যবিবরণীর খসড়া তৈরি করতে সক্ষম। ফলে কোম্পানি সচিবের ওপর থেকে ম্যানুয়াল নোট নেওয়ার চাপ কমে যায় এবং তিনি পর্ষদের আলোচনা ও নীতিগত পরামর্শে বেশি মনোনিবেশ করতে পারেন।
রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স ও ডাটা বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নানা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন নতুন নির্দেশনা ও আইনের সাথে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ থাকতে হয় কোম্পানি সেক্রেটারিদের। এআই সিস্টেম অতি দ্রুত হাজার হাজার পৃষ্ঠার আইনি দলিল বিশ্লেষণ করে নতুন রেগুলেশনের ফলে প্রতিষ্ঠানের কোন কোন নীতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে পারে। এছাড়া, ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিসমূহ (Risk Management) আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
তথ্য নিরাপত্তা ও বোর্ড পেপার প্রস্তুতকরণ
পর্ষদ সদস্যদের জন্য শত শত পৃষ্ঠার ‘বোর্ড প্যাক’ তৈরি ও বিতরণ একটি জটিল কাজ। এআই- ভিত্তিক গভর্নেন্স প্ল্যাটফর্মগুলো দীর্ঘ ও জটিল প্রতিবেদনগুলোর মূল অংশ সারসংক্ষেপ (Summarize) করে বোর্ড মেম্বারদের সামনে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে। এনক্রিপ্টেড এবং এআই-সুরক্ষিত এই প্ল্যাটফর্মগুলো গোপনীয় তথ্য ফাঁস হওয়া প্রতিরোধ করে এবং পরিচালনা পর্ষদকে তথ্যভিত্তিক দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
কৌশলগত উপদেষ্টা হিসেবে কোম্পানি সচিবের উত্তরণ
অনেক সময় মনে করা হয় এআই হয়তো মানুষের চাকরি প্রতিস্থাপন করবে। তবে করপোরেট গভর্নেন্সে এআই কখনোই কোম্পানি সচিবের পেশাদার নৈতিকতা, আইনি প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার বিকল্প হতে পারে না। বরং এটি সচিবালয়ের রুটিন ও প্রশাসনিক কাজের জটিলতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে একজন কোম্পানি সেক্রেটারি কেবল একজন ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ বা নথি রক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে পর্ষদের একজন প্রকৃত ‘কৌশলগত উপদেষ্টা’ (Strategic Advisor) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাচ্ছেন।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
বোর্ডরুম ও কোম্পানি সচিবালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের যেমন বিপুল সুবিধা রয়েছে, তেমনি এর সাথে যুক্ত রয়েছে সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ। পরিচালনা পর্ষদের গোপনীয় সিদ্ধান্ত, আর্থিক প্রতিবেদন বা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এআই প্ল্যাটফর্মে ইনপুট দেওয়ার আগে অবশ্যই এন্ড-টু-এন্ড ডাটা এনক্রিপশন ((Data Encryption)) নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো পাবলিক এআই টুলের বদলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাইভেট ও সিকিউরড ক্লাউড অথবা পেইড এআই ব্যবহার করা জরুরি, যেন অভ্যন্তরীণ কোনো তথ্য থার্ড-পার্টি মডেলে লিক বা প্রশিক্ষণ (ঞৎধরহরহম) ডেটা হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। এছাড়া ডাটা প্রাইভেসি, সাইবার থ্র্রেট এবং কপিরাইট ও কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত ঝুঁকি এড়াতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘এআই ব্যবহারের নির্দেশিকা’ বা এআই এথিক্স পলিসি মেনে চলা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি স্তরে কঠোরভাবে গোপনীয়তা (Confidentiality) বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ভবিষ্যতের করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কোম্পানি সচিবালয়গুলোকে এখনই নিরাপদ ও দায়িত্বশীল এআই প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো এআইকে তাদের
বোর্ডরুমে সঠিকভাবে কাজে লাগাবে, কেবল তারাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় করপোরেট গভর্নেন্সে এগিয়ে থাকবে।
লেখা:
রেজাউল করিম
কোম্পানী সেক্রেটারী
মধুমতি ব্যাংক পিএলসি
Email: reza34ju@gmail.com






