শিল্পী সুলতানের শিষ্য ধর্মদাস মল্লিকের বাড়ি জীবন্ত সংগ্রহশালা

২৬ জুন, ২০২৬ - রাত ৯:৪৩
 965
শিল্পী সুলতানের শিষ্য ধর্মদাস মল্লিকের বাড়ি জীবন্ত সংগ্রহশালা
শিল্পী সুলতানের শিষ্য ধর্মদাস মল্লিকের বাড়ি জীবন্ত সংগ্রহশালা

বাড়ির নাম ‘চারুকুঠি’, বাড়িটির মালিক ধর্মদাস মল্লিক। বাড়ির পুরোনো কাঠের দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে—দেয়ালে ঝোলানো সারি সারি ছবি। ছাদের একচালাতেও একই দৃশ্য—রঙ, রেখা আর কল্পনার মেলায় সাজানো এক জীবন্ত সংগ্রহশালা।

সব ছবিতেই যেন ভেসে ওঠে চিত্রকলার বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস.এম. সুলতানের ছাপ। দেয়ালে ঝোলানো ছবির পাশে রাখা আছে টেরাকোটা, ছোট ছোট ভাস্কর্য আর গ্রামবাংলার পুরোনো তৈজসপত্র। এমনকি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠার পথেও ঝুলছে একটার পর একটা ক্যানভাস।

ধর্মদাস মল্লিক শিল্প মহলে ' ডিডি মল্লিক" নামে পরিচিত। তার বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামে। তিনি কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের শিষ্য। তার পিতার নাম সরোজ মল্লিক, মায়ের নাম সুমিত্রা মল্লিক। ঢাকায় দুই দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন চিত্রশিক্ষা, প্রদর্শনী পেশাগত কাজে। খুলনা আর্ট কলেজ থেকে শুরু করে চিটাগাং চারুকলা ইনস্টিটিউট, পরে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, সবশেষ ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ থেকে এম.এফ.. (চারুকলায় স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তার আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয়েছে দেশ-বিদেশে।

প্রতি শুক্রবার সকালে দূরদূরান্ত থেকে অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থী আসেন তার কাছে ছবি আঁকা শেখার জন্য। এক টাকাও ফি নেন না তিনি। বিনা মূল্যের এই শিল্পবিদ্যালয়ের নাম দিয়েছেন—‘চারুকুঠি শিল্পালয় ২০২০ সাল থেকে চলছে এই পাঠশালা।

 শিল্পী হবেনএমন কোনো স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেননি ধর্মদাস মল্লিক। শুরুতে তার আঁকা ছিল নিঃশব্দ প্রতিবাদের ভাষা। একবার এক প্রতিবেশী তাঁর একটি কবুতর মেরে ফেলেছিলেন। সেই অন্যায় গভীর দাগ কেটেছিল কিশোর ধর্মদাসের মনে। ব্যথিত মনে তিনি বাড়ির মাটির দেয়ালে আঁকলেন মৃত কবুতরের ছবি, নিচে লিখলেন—‘জীব হত্যা মহাপাপ, নরকে গমন।সেখান থেকেই ছবি হয়ে ওঠে তার প্রতিরোধের হাতিয়ার। গ্রামের অন্যায়অবিচারের প্রতিবাদ জানাতেন রঙে রেখায়।

গুরু সুলতানের কাছ থেকে যেভাবে ছবি আঁকা শিখেছিলেন ধর্মদাস, সেভাবেই শিশুদের শেখানোর চেষ্টা করেন তিনি। চারুকুঠি তার কাছে শুধু আঁকার জায়গা নয়, প্রকৃতি জীবনের পাঠশালা।শিশুদের মাটির গন্ধ, সূর্যের তাপ, বৃষ্টির ছোঁয়া অনুভব করাতে হবে। তাই এখানে তারা শুধু ছবি আঁকা শেখে না, চাষও করে, ফসল ফলায়, মাছের পোনা ছাড়ে। প্রতি শনিবারেএসো কাজ শিখিনামে বিশেষ সেশন হয় চারুকুঠিতে, যেখানে বাগান পরিচর্যা, জীববৈচিত্র্য বোঝা প্রকৃতিকে জানার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা।

ধর্মদাসের স্বপ্নআর্থিক সহযোগিতা পেলে শিমুলিয়ায় তার অসমাপ্ত বাড়িটি একদিন সমাপ্ত হবে। বাড়িজুড়ে থাকবে তার আঁকা ছবি, যা মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখবে। একটি কক্ষে ঠাঁই পাবে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ পেশা, সরঞ্জাম গল্প, যা দেখে নতুন প্রজন্ম চিনবে নিজের শিকড়।